Wednesday, October 17, 2018
Login
Username
Password
  সদস্য না হলে... Registration করুন
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম                  শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব                

উপ- সম্পাদকীয়


মুক্তিযুদ্ধের এলাকাভিত্তিক ইতিহাস সংকলন দরকার
আতাউর রহমান মিটন :
সময় : 2018-03-13 18:39:51

শুরুতেই নেপালের কাঠমুন্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত সকলের আত্মার শান্তি কামনা করছি। সমবেদনা জ্ঞাপন করছি স্বজন হারানোর ব্যাথায় কাতর পরিবারগুলোর প্রতি। দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি যারা আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দুর্ঘটনা কখন কিভাবে সংঘটিত হবে আমরা জানিনা, তবে এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা কারোরই কাম্য নয়। কর্তৃপক্ষের গাফিলতি বা উদাসীনতা যদি সত্যিই এর কারণ হয় তাহলে শক্ত হাতে বিহিত করার দাবী জানাচ্ছি। 

সংগ্রাম ও স্বাধীনতার মাস মার্চ। অগ্নিঝরা এই মাসের মূল মর্মবাণী ‘জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়’। বাঙালীর শক্তি  ও সামর্থ্যরে মূর্ত প্রতিক এই মার্চ। আমরা যে হার না মানা, পোষ না মানা জাতি তা ফুটে ওঠে এই মার্চের অগ্নিঝরা দিনগুলোর বিশ্লেষণের মাধ্যমে। বিভিন্ন সময়ে শহীদ সংগ্রামীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার আজকের এই নিবেদন। 

মার্চ মাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। পৃথিবীতে খুব কম জাতি রয়েছে যাঁরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করেছে। আমাদের মত করে নিরস্ত্র হয়েও সুপ্রশিক্ষিত ও দক্ষ একটি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনার নজির খুব বেশি নেই। বাঙালীর ঐক্য চেতনা ও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা আমাদের জয়ের মূলমন্ত্র হয়েছিল বলেই আজ আমরা স্বাধীন। আমরা সার্বভৌম। 

স্বাধীনতা জন্য সংগ্রাম একটা অবিস্মরণীয় ঘটনা। কত মানুষ যে কতভাবে এই ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছেন, চারিদিকে যে কত না বলা গল্প এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তা আমরা অনুমানও করতে পারি না। সারাদেশেই অসংখ্য র্কীতিমান মানুষের গল্প ছড়িয়ে আছে যাদের কথা আজকের প্রজন্ম হয়তো জানে না। মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের এখন বয়স হয়েছে। প্রকৃতির নিয়মে কখন কে চলে যাবেন আমরা জানি না (দোয়া করি তাঁরা দীর্ঘায়ূ লাভ করুন), কিন্তু তাঁরা চলে গেলে আমরা সেই গল্পগুলো জানতে পারব না! পর্দার আড়ালে থাকা বহু মানুষ যারা দুঃসাহস দেখিয়ে আমাদের স্বাধীনতা লাভের পথ সুগম করেছিলেন তাদের কথা অজানাই থেকে যাবে। এটা হতে দেয়া যায় না।  

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার কাজটি হয়তো কঠিন। সকলকে দিয়ে সেটা সম্ভব নয়, রাষ্ট্রকে এর জন্য এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি এলাকার বীরত্বগাঁথাকে সংকলিত করার একটা বড়ধরণের উদ্যোগ রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। বাঙালীর এতবড় সংগ্রামের কাহিনী অপ্রকাশিত বা অজানা থাকাটা কোনভাবেই কাম্য নয়। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবী জানাই সকল জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী সংকলিত করার উদ্যোগ গ্রহণের। এই কাজে অর্থ ব্যয়ে সরকারের কার্পণ্য থাকার কোন কারণ নেই। সরকার চাইলে এর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে। মূল কথাটা হচ্ছে উদ্যোগ নেয়া। 

সরকারের কাছে দাবী জানানোর পাশাপাশি আমরাও তো একাজে সহজেই এগিয়ে আসতে পারি। আমাদের আঞ্চলিক পত্রিকাগুলো যদি নিজেদের এলাকার এমন ছোট ছোট গল্পগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নেয় তাহলেও কিন্তু অনেক গল্প পাওয়া যাবে। পত্রিকাগুলো যদি ঘোষণা দেয় তারা এমন ছোট ছোট না বলা কাহিনীগুলো ছাপবে তাহলে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে সেই গল্পগুলো সংগ্রহ করবে এবং লিখতে উৎসাহী হবে। বীরত্বের এমন ছোট ছোট গল্পগুলো সকলেরই হৃদয় ছুঁয়ে যাবে তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। 

কয়েকদিন আগে দৈনিক করতোয়া পত্রিকায় লেখা বগুড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধ টি এম মুসা পেস্তা ভাইয়ের লেখা থেকে জানতে পারলাম ‘মার্চের প্রতিরোধ সংগ্রামে পাক-বাহিনীর গুলিতে আমরা ভোলা নামের রিক্সাচালক, বগুড়া জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র টি এম আইয়ুব টিটু এবং দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মোজাম্মেল হক’র বড় ভাই আজাদকে হারিয়েছি। যুদ্ধরত অবস্থায় ছুনু, হিটলু ও দোলনকে হানাদার পাক বাহিনী আটক করে নিয়ে যায়। তারপর থেকে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।’ এই তথ্যগুলো পড়ে এবং জেনে একদিকে চোখ জলে ভেসে যায়, আবার অন্যদিকে মনের গহীনে সংগ্রামী এক সিংহ তাঁর কেশর দুলিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে জেগে ওঠে। যুগপৎ এই অনুভূতির তাড়না থেকেই আমি সবিনয়ে প্রস্তাব করছি যে, এই ছোট ছোট কাহিনীগুলো সংকলিত করা হোক। জাতিকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া হোক।  অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রতিটি এলাকার অবদানের কথা, সংগ্রামের কথা লিপিবদ্ধ করা হোক। একদিনে সেটা সম্ভব নয়। এটা গবেষণা ও তথ্য নির্ভর হওয়া অপরিহার্য। সে কারণে একটা গবেষণা প্রকল্প হিসেবে কাজটি করে যেতে হবে। তবে স্বেচ্ছায় গ্রামের যুবকেরাও তাদের নিজ নিজ গ্রামের বা এলাকার মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী লিখে তা সংকলিত রাখার উদ্যোগ নিতে পারেন। আমাদের তরুণেরা যদি দেশের প্রতিটি এলাকায় নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে কেবলমাত্র নিজেদের এলাকার মুক্তি সংগ্রামের গৌরবময় দিনগুলোর কথা লিখে রাখার উদ্যোগ নেন তাহলে সেটা হবে বাংলাদেশের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা, আমাদের সংগ্রামের আরেকটি মহান গৌরবগাঁথা। শুরু করতে হবে এখনই। অন্যেরা করুক, তারপরে আমি করব এটা বলে বসে থাকা যাবে না। শুরুটা হতে হবে নিজেকে দিয়েই। 

বাংলাদেশে এখন তারুণ্যের একটা ইতিবাচক সময় যাচ্ছে। ভোট দিয়ে সরকার গঠন থেকে শুরু করে সরকারে থেকে দেশ পরিচালনায় আমাদের তরুণদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। সরকার তরুণদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধাবিত করার জন্যে নানাভাবে চেষ্টা করছে। আমার এক বন্ধু সাংবাদিক খন্দকার আছাব মাহমুদ উদ্যোগী হয়ে তার নিজ উপজেলা টাঙ্গাইলের নাগরপুরে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বই স্কুলে স্কুলে বিতরণের কর্মসূচী নিয়েছে। শুনেছি আরও অনেকেই এটা করছেন। খুবই ভাল উদ্যোগ। বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক ডঃ জাফর ইকবাল স্যার প্রায় একদশক আগে ‘ছোটদের মুক্তিযুদ্ধ’ নামে একটি চটি বই প্রকাশ করে সারাদেশে বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। প্রতীতি নামের একটি সংগঠন থেকে ২০০৮ সালে এই কর্মকান্ড হাতে নেয়া হয়েছিল। আমি নিজেও সেই বই বিতরণের একজন সামান্য স্বেচ্ছাসেবক ছিলাম। কলেবরে খুব ছোট (২৪ পৃষ্ঠা) এই বইটির মত করে আমাদের তরুণেরাও নিজেদের এলাকার মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা বা মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামের দিনগুলোর কথা সংকলিত করার উদ্যোগ নিতে পারেন। মুক্তিযুদ্ধ মানেই কেবল ঢাকার সংগ্রাম নয়, মুক্তিযুদ্ধ মানেই কেবল একজন মহান ব্যক্তির গুণকীর্তন নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্যা গল্প, অসংখ্য কাহিনী। বিশাল সমুদ্র যেমন আসলে অসংখ্য জলবিন্দুর সমষ্টি, তেমনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধও আসলে অসংখ্য ঘটনা ও কাহিনীর সম্মিলিত রূপ। জাতীয় ঘটনাবলী সম্পর্কে আমাদের জানার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে কিন্তু স্থানীয় সংগ্রাম ও গৌরবের অধ্যায়গুলোর আয়োজন কোথায়? 

‘প্রত্যাশা ২০২১ ফোরাম’ নামে একটি স্বেচ্ছাব্রতী সংগঠনের সাথে আমি জড়িত। ‘মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হোক দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশে’ এই শ্লোগান নিয়ে সেই ২০০৫ সাল থেকে সংগঠনটি মানুষকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে। আগামী ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংগঠনের উদ্যোগে সারাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী’ উদযাপন করা হবে। দেশের মানুষ এই মহোৎসবে প্রাণের মায়ায় যুক্ত হবে। প্রত্যাশা ২০২১ ফোরাম এর সদস্যরা সুবর্ণজয়ন্তীর এই উৎসবের জন্য নিজেরা ১০০ টাকা অনুদান দিয়ে একটি তহবিল গড়ে তুলছে। ব্যাংকে জমা হচ্ছে সেই টাকা যা খরচ হবে ২০২১ সালে। গত ১০ মার্চ ফোরামের সদস্যরা ঢাকার পাশেই মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদ এর ‘পারিল’ নামের গ্রামে সম্মিলিত হয়েছিল। ফোরামের পক্ষ থেকে ঐ গ্রামে ২০২১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আমি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জাননোর সাথে সাথে এটাও প্রস্তাব করছি যে, মুক্তিযুদ্ধে পারিল গ্রাম বা বলধারা ইউনিয়নে কি ঘটেছিল তা লিখে ফেলার। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষেরা যাঁরা ২০২১ সালে নিজেদের গ্রামে বা ইউনিয়নে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তুী উদযাপনে আগ্রহী তাঁরা ফোরামের সচিবালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁরা লিখতে পারেন নিজের এলাকার গৌরবগাঁথা। আমার মনে হয় এভাবে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা সংকলিত করার মাধ্যমে আমরা আমাদের অগ্রজ মুক্তিসেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে পারি। 

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। স্বাধীনতা অর্জনের সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আকাঙ্খা ছিল প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের জন্য এমন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা যেখানে মানুষ দারিদ্রে কষ্ট পাবে না, তার  জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূর্ণ হবে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার সুযোগ মিলবে। জীবন হবে উন্নত মানের এবং সুন্দর। গণতন্ত্রের সুরক্ষা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আরেকটি আরাধ্য। কোন অজুহাতেই আমরা যেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যো দিয়ে পাওয়া বাহাত্তরের সংবিধান থেকে দূরে সরে না যাই। আমাদের এগিয়ে চলার জন্য নানাধরণের রূপকল্প থাকবেই কিন্তু তাই বলে শেকড়কে তো আমরা অস্বীকার করতে পারব না। তাই আমাদেরকে বাহাত্তরের সংবিধানের অন্যতম চার মূলনীতিকে শেকড় হিসেবে গণ্য করে দেশ পরিচালনার অন্যান্য নীতি ও কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। এই চেতনা ও প্রেরণা আরও বলিষ্ঠ হবে যখন আমরা নিজেদের এলাকার, নিজেদের চেনা মানুষগুলোর সংগ্রাম, ত্যাগ ও স্বপ্নের সাথে পরিচিত হবো। অতীতকে জানতে হবে ভবিষ্যতের প্রয়োজনে। 

সকল মন্তব্য

মন্তব্য দিতে চান তাহলে Login করুন, সদস্য না হলে Registration করুন।

সকালের আলো

Sokaler Alo

সম্পাদক ও প্রকাশক : এস এম আজাদ হোসেন

নির্বাহী সম্পাদক : সৈয়দা আফসানা আশা

সকালের আলো মিডিয়া ও কমিউনিকেশন্স কর্তৃক

৮/৪-এ, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০ হতে প্রকাশিত

মোবাইলঃ ০১৫৫২৫৪১২৮৮ । ০১৭১৬৪৯৩০৮৯ ইমেইলঃ newssokaleralo@gmail.com

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত

Developed by IT-SokalerAlo     hit counters Flag Counter