Wednesday, July 18, 2018
Login
Username
Password
  সদস্য না হলে... Registration করুন

উপ- সম্পাদকীয়


ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন প্রসঙ্গে ডঃ মাহবুব তালুকদারের সাক্ষাৎকার
এম এ খালেক :
সময় : 2018-04-11 14:00:25

শুরু হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন রাস্তার নির্মাণ কাজ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফরে গিয়েছিলেন এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এআরআই) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট) এর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার। তার এই সফর প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তারিত আলাপচারিতায় সম্প্রতি মুখোমুখি হয়েছিলেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি এম এ খালেক এর সঙ্গে।

 পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে দেয়া হল-

এম এ খালেক: আপনি সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফরে গিয়েছিলেন। আপনি বহুল আলোচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন মহাসড়কের নির্মাণ কাজের অগ্রগতি কেমন দেখলেন?

ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার: ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন রাস্তার নির্মাণ কাজের অগ্রগতি খুব একটা খারাপ নয়। কাজ ভালোভাবেই এগুচ্ছে। তবে কবে নাগাদ কাজ পুরোপুরি শেষ হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে আমার মনে হয় এই মহাসড়কের নির্মাণ কাজ শেষ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। কারণ জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যা আছে। যে সব জমি ইতোমধ্যেই অধিগ্রহণ করা হয়েছে তা অনেকটাই বিচ্ছিন্নভাবে করা হয়েছে। জমিগুলো একই সঙ্গে অধিগ্রহণ করতে পারলেই ভালো হতো। ফোর লেনটা একটির চেয়ে অন্যটি কিছুটা দূরত্বে হওয়াতে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যেহেতু বিভিন্ন ধরনের সমস্যা ছিল তাই এই সড়কের নির্মাণ কাজ কখন শেষ হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অতীত অভিজ্ঞায় দেখা গেছে, এ ধরনের বড় কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বারা করালে ভালো হয়। তারা সবকিছু ঠিকভাবে ম্যানেজ করতে পারে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সদস্যরা যদি কোনো কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে সেখানে জমি অধিগ্রহণ থেকে অনেক কাজই সহজ হয়ে যায়। কিন্তু সাধারণ ঠিকাদারগণ সেভাবে ম্যানেজ করতে পারে না। কারণ তাদের উপর স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের চাপ থাকে। ফলে তারা নিরবিছিন্নভাবে কাজ করতে পারে না। কাজেই কৌশলগত ভাবে সেনাবাহিনীকে দিয়েই এ ধরনের কাজগুলো করানো উচিৎ বলে আমি মনে করি। উদাহরণ হিসেবে হাতির ঝিল প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। হাতির ঝিল প্রকল্পটি সেনা সদস্যদের দিয়ে করানোর ফলে এখানে কোনো ধরনের সমস্যা হয় নি। কিন্তু এটা যদি সরকার অন্য কোনো সংস্থাকে দিয়ে করাতেন তাহলে জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রেই সমস্যার সৃষ্টি হতো। ঢাকা-ময়মনসিংহ রোড সেনাবাহিনী নির্মাণ করায় কোনো সমস্যা হয় নি। ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোড। কাজেই এটা বাস্তবায়নের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দিলেই সবচেয়ে ভালো হতো। নির্মাণ কাজও তুলনামূলকভালো মানসম্পন হতো। স্থানীয়ভাবে রাস্তা বা যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে ধর্র্মীয় অনুভূতি অনেক সময় বাধ হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো দেখা গেলে একটি রাস্তা নির্মাণ হচ্ছে কিন্তু তার মাঝখানে একটি কবরস্থান পড়ে গেলো। মানুষের মাঝে তখন ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত হয়ে উঠে। তারা নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে। এই সমস্যা কোনো রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেনা সদস্যরা যদি কাজটি করে তাহলে তারা খুব সহজেই বিষয়গুলো ম্যানেজ করতে পারে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন নির্মাণ কাজ শেষ হলে গাড়ির গতি অনেকটা বেড়ে যাবে। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে প্রচুর গাড়ি চলাচল করে। তাই আগামীতে এটাকে এইট লেন করতে হবে।

এম এ খালেক: ফোর লেন রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে যে সব শর্ত পরিপালন করতে হয় এ ক্ষেত্রে কি তা করা হয়েছে?

ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার: ফোর লেন রাস্তা নির্মাণ করতে হলে যে সব শর্ত পালন করতে হয় বাংলাদেশের কোনো ফোর লেন রাস্তাতেই তা করা সম্ভব হয় নি। ফোর লেন রাস্তা অনেকটা ফাইভ স্টার হোটেলের মতো। যেখানে মানুষের কোনো ধরনের সমস্যা থাকবে না। কার্যকর ফোর লেন রাস্তা নির্মাণ করতে হলে সেখানে আন্ডার পাস থাকতে হবে। ওভার ব্রিজ থাকবে। ফুট ওভার ব্রিজ থাকবে। কোনোভাবেই একজন পথচারি রাস্তায় উঠতে পারবে না। তার চলাচলের জন্য আলাদা পরিকল্পিত ব্যবস্থা থাকবে। রাস্তায় বেরিকেট থাকবে। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা করা সম্ভব নয়। যেহেতু আমাদের এখানে যে ফোর লেন রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে তাতে এসব শর্ত পরিপালিত হচ্ছে না তাই ঝুঁকি থাকবেই। আগামীতে এসব ঝুঁকি আরো বাড়তে থাকবে। ফোর লেন রাস্তা নির্মাণের ফলে যানবাহনের মুখোমুখি দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। আমরা জানি আমাদের দেশে যত দুর্ঘটনা হয় তার ৫২ শতাংশই সংঘঠিত হয় পথচারিদের অসতর্কতার কারণে। ফোর লেন রাস্তা নির্মিত হবার ফলে পথচারি দুর্ঘটনার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।

এম এ খালেক: আপনি সম্প্রতি একটি দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা বলবেন কি?

ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার: গত ২৩ মার্চ সকাল সাড়ে ৬টায় আমি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রওনা করি। প্রায় সাড়ে তিনটায় আমি চট্টগ্রাম উপনীত হই। বিভিন্ন স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ চলছে। এসব কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। এই যানজটের কারণে গাড়ির চালকদের মাঝে এক ধরনের প্রবণতা কাজ করে কিভাবে সময় ম্যানেজ করে আগে গন্তব্য স্থলে যাওয়া যায়। যানজটের কারণে যে সময় লস হয় তা পুষিয়ে নেবার জন্য তারা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে চায়। এটা দুর্ঘটনার জন্য অন্যতম কারণ। স্বাভাবিক অবস্থায় ঢাকা হতে চট্টগ্রাম যেতে ৪ থেকে ৫ ঘন্টা সময় লাগে। কিন্তু যানজটের কারণে সেখানে সময় লাগছে ১০ ঘন্টা। যানজটের এই ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য বাস,ট্রাক,প্রাইভেট কার এর চালকগণ সুযোগ পেলেই গাড়ির গতি সীমা বাড়িয়ে দেয়। এসময় কোনো পথচারি সামনে এলেই সংঘাত সৃষ্টি হয়। ফেরার দিন আমি সকালে চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেই এবং বিকেল ৫টায় ঢাকা এসে পৌঁছি। যেখানে রাস্তার পাশে হাট-বাজার গড়ে উঠেছে সেখানেই দুর্ঘটনা বেশি হয়। ফোর লেন রাস্তা নির্মিত হবার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি চলে এসেছে মার্কেট প্লেসে। যেখানেই রাস্তার পাশে হাট-বাজার গড়ে উঠেছে সেখানেই দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। অধিকাংশ মানুষই হাট-বাজারের নিকট দিয়ে মানুষ রাস্তা পার হবার সময় অসতর্কভাবে রাস্তা পার হয়। বাড়ির উঠানে যেমন মানুষ নিশ্চিন্তে চলাচল করে ঠিক একই ভাবে হাট-বাজারের নিকট দিয়ে মানুষ রাস্তা পার হচ্ছে। একটি ব্যস্ত রাস্তা পেরুনোর সময় যে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন এই বোধটুকুই তাদের মাঝে নেই। তারা ডানে বামে না তাকিয়েই রাস্তা পার হচ্ছে। আমি শত শত মানুষকে এভাবে রাস্তা পেরুতে দেখেছি। কিন্তু হাইওয়েতে গাড়ি চলে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে। সেখানে কেউ একজন অসতর্কভাবে সামনে এসে পড়লে গাড়ি চালকের পক্ষে সব সময় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। যে কোনো দুর্ঘটনার জন্য আমরা সাধারণত গাড়ির চালককেই দায়ি করে থাকি। কিন্তু যারা রাস্তা পার হয় তাদের অসতর্কতাও যে দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ তা আমরা বুঝতে চাই না। গাড়ির চালকের তুলনায় পথচারিদের অসতর্কতার জন্যই বেশি দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ফোর লেন হবার ফলে এই রাস্তায় গাড়ির গতি অত্যন্ত বেড়ে যাবে। কিন্তু পথচারিরা প্রায়শই কোনো দিকে না তাকিয়ে রাস্তা পার হতে চায়। ফলে মারাত্মক দুর্ঘটনায় পতিত হয়। নির্ধারিত স্থান দিয়ে দিয়ে রাস্তা পার না হয়ে যেখানে পারছে সেখান দিয়েই রাস্তা পার হচ্ছে মানুষ। মূলত এসব কারণেই মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি মনে করি, রাস্তার পাশে যে সব হাট-রাজার গড়ে উঠেছে এগুলোই দুর্ঘটনার জন্য ব্লাক স্পট হিসেবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে। চট্টগ্রাম থেকে আসার পথে অনেকের সঙ্গেই আলাপ করেছি। তারা বলেছেন, প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। হয়তো বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই খুব একটা মারাত্মক আকারের নয়। ফলে সেগুলোর খবর আমরা জানতে পারছি না,যদিও এ ধরনের ছোট ছোট দুর্ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে। রাস্তা পার হবার সময় ডানে-বামে দু’দিকেই তাকানো উচিৎ। কারণ অনেক সময় রাস্তার দু’দিক থেকেই গাড়ি আসে। কিন্তু যারা রাস্তা পার হন তাদের অনেকেই দু’দিকে তাকান না। ফলে দুর্ঘটনা সংঘঠিত হয়। আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম,নতুন রাস্তা হবার ফলে রাস্তার দক্ষিণ পাশের্^ কোনো পেট্রোল পাম্প নেই বললেই চলে। ফলে জ¦ালানি তেল নেবার জন্য গাড়িকে অনেকটাই ঘুরে আসতে হয়। এভাবে ঘুরে আসতে গিয়ে প্রায়শই গাড়ি দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। কাজেই যত দ্রুত সম্ভব রাস্তার দক্ষিণ পাশের্^ পেট্রোল পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। অনেক সময় পথচারিরা রাস্তা পার হবার সময় হঠাৎ করেই দৌঁড় দেয়। এতে গাড়ির চালক ইচ্ছে করলেও গড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যারা রাস্তায় চলাচল করে তাদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ শতাংশ মানুষ রাস্তা পারাপারের ব্যাপারে সচেতন আছে। বাকি ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ মানুষ রাস্তা পার হবার ক্ষেত্রে মোটেও সচেতন নয়। তারা অসতর্কভাবে রাস্তা পারাপার হন। ফলে যখন তখন দুর্ঘটনা সংঘঠিত হচ্ছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রথমেই গাড়ির চালককে দায়ি ভেবে মারধোর করা হয়। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গাড়ির চালকের চেয়ে পথচারিদের অসতর্কতাই দুর্ঘটনার জন্য বেশি দায়ি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ বা হ্রাস করতে হলে প্রথমেই সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে যারা পথচারি তাদের ট্রাফিক আইন এবং দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে সচেতন করে খুবই জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,জননেত্রী শেখ হাসিনা কিছু দিন আগে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য বা আহ্বার অত্যন্ত সময়োপযোগি এবং বাস্তবধর্মী। কিন্তু তার বক্তব্যের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। আমাদের দেশে দুর্ঘটনার জন্য গাড়ির চালক যেমন দায়ি, তার চেয়েও বেশি দায়ি হচ্ছেন পথচারিরা। কাজেই পথচারিদের সতর্ক করতে না পারলে গাড়ি সড়ক দুর্ঘটনা কোনোভাবেই হ্রাস করা যাবে না। পথচারি কখনো মনে করে না যে রাস্তায় চলাচল করার সময় তারও কিছু দায়িত্ব আছে। তারও সচেতন থাকতে হবে। রাস্তা কিভাবে পার হতে হয় সে ব্যাপারে আমাদের ঐতিহ্য ছিল না। কারণ আমাদের দেশে আগে রাস্তা-ঘাট খুব একটা ছিল না। মানুষ জমির আইল দিয়ে হাঁটতো। এখনো অনেকেই রাস্তাকে জমির আইল বলেই মনে করেন। উন্নত দেশের মানুষ কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের মতো অসচেতন নয়। তারা ঠিকই রাস্তায় চলাচলের নিয়ম মেনে চলে। আমাদের দেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই সড়কে চলাচলের নিয়ম মেনে চলতে শিখে নাই। গ্রামের এক শ্রেণির মানুষ রাস্তায় চলাচল করার সময় ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে চলে। যেনো গাড়ি চালক তাকে দেখে ভয় পাবে। তাই দুর্ঘটনা ঘটানোর সাহস পাবে না। কিন্তু তারা এটা বুঝতে চায় না যে, গাড়ির চালক ভয় পেলেও গাড়ি তো তাদের দেখে ভয় পায় না। আর গাড়ির চালক ইচ্ছে করলেই চলন্ত গাড়ি হঠাৎ করেই থামিয়ে দিতে পারে না।
আমি আসার সময় গৌরিপুরের একটি বাজারের নিকট দিয়ে গাড়ি অতিক্রম করছিল।

এখানে একটি বাই লেন চলে গেছে। অনেকেই উল্টো পথে এখানে আসতে চায়। আমাকে বহনকারি গাড়ি চলছিল। এমন সময় একজন মহিলা বাচ্চা কোলে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। মহিলার মাথায় ঊর্ণা পেচানো থাকায় তিনি ভালোভাবে রাস্তা দেখতে পাচ্ছিল না। মহিলা খেয়াল করতে পারেনি যে উল্টো দিক থেকে গাড়ি আসছে। আমার গাড়ির সাইডের দিকে মহিলার সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে মহিলা আঘাত পায়। যদিও আঘাতটি খুব একটা গুরুতর নয়। তার পা কিছুটা ছিঁলে যায়। দুর্ঘটনার পর আমি চালককে বললাম, তুমি গাড়ি থামাও। এসময় বেশ কিছু মানুষ আশে পাশে থেকে গাড়ির নিকট চলে আসে। তারা চালককে গাড়ি থেকে নামতে বলে। কিন্তু আমি তাকে গাড়ি থেকে নামতে নিষেধ করি। গাড়ি চালক গাড়ি থেকে নামলেই তাকে পেটানো হতো। কিন্তু চালকের কোনো দোষ ছিল না। মহিলা নিজের দোষে দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছেন। চালক রীতিমতো হর্ন বাজিয়েছে। গাড়ির গতি মন্থর করেছে। চালক যদি গাড়ির গতি না কমাতো তাহলে মহিলা সরাসরি গাড়ির নিচে গিয়ে পড়তো। আমি হাইওয়ে পুলিশকে ডেকে আনলাম। বললাম,আপনি গাড়ি চালককে সুরক্ষা দেন আমি মহিলাকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। মহিলাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে তার এক্স রে করালাম। তার পায়ে তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। আমি পুরো চিকিৎসা ব্যয় বহন করি। মহিলার স্বামী ব্যাংকে চাকরি করেন। তার সঙ্গে কথা বললাম। মহিলার দেবর এলেন। তার নিকট মহিলাকে বুঝিয়ে দিয়ে আমরা চলে আসি। প্রসঙ্গক্রমে ডাক্তার জানালেন, এ ধরনের দুর্ঘটনার রোগি আমরা প্রায় প্রতিদিনই পাচ্ছি। এই দুর্ঘটনা থেকে আমার অভিজ্ঞতা হলো, আমাদের দেশের মানুষ দুর্ঘটনায় পতিত হয় অনেক সময়ই তার নিজের দোষে। দুর্ঘটনা ঘটলে সাধারণত মানুষ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু আমি মহিলাকে নিজ দায়িত্বে চিকিৎসা করিয়েছি। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে গাড়ি চালকের প্রথম কাজ হবে আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা করানো। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায় গাড়ি চালক দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যায়। কারণ যারা ঘটনাস্থলের আশে পাশে উপস্থিত থাকেন তারা দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান না কররেই গাড়ি চালককে পেটাতে শুরু করে। তারা গাড়ি চালককে পিটিয়ে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ উপভোগ করে। এটা মোটেও কাম্য হতে পারে না। কারণ কারোই আইন হাতে তুলে নেয়া উচিৎ নয়। জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। সাধারণ মানুষ যদি এ ব্যাপারে সচেতন না হয় তাহলে গাড়ি চালক ইচ্ছে করলেও দুর্ঘটনা কবলিত মানুষকে সাহায্য করতে পারবে না। মহিলা আমার গাড়িতে দুর্ঘটনা কবলিত হবার পর আমি এক ধরনের অস্বস্তি এবং মনোপীড়ায় ভুগছিলাম। তারপর তাকে চিকিৎসা করানোর পর কিছুটা হলেও শান্তি পেলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানানোর পরও কিন্তু দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবছি বলে মনে হয় না। আমাদের সবাইকে দুর্ঘটনার বিষয়ে সচেতন এবং সতর্ক থাকতে হবে। যে সব বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবি প্রতিষ্ঠান আছে তারা জনগণেকে সচেতন করার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করতে পারেন। একুশে পদক প্রাপ্ত চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামক সংগঠনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে চলেছেন। তবে এ ধরনের সংগঠন আরো গড়ে তোলা যেতে পারে। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ যেভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করে চলেছে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। রাস্তার পাশে যে সব হাট-বাজার আছে সেখানে সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাবার পর তা প্রতিকারের উদ্যোগ গ্রহণের চেয়ে দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণই জরুরি। এ জন্য সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে দুর্ঘটনার কারণ এবং তা থেকে পরিত্রাণের বিষয়ে উপায় সম্পর্কে অবহিত করা। তারা যাতে বিদ্যমান আইন মেনে চলে তাও নিশ্চিত করতে হবে।

ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার
অধ্যাপক
এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট(এআরআই)
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট)
ঢাকা।

আরো সংবাদ

সকল মন্তব্য

মন্তব্য দিতে চান তাহলে Login করুন, সদস্য না হলে Registration করুন।

সকালের আলো

Sokaler Alo

সম্পাদক ও প্রকাশক : এস এম আজাদ হোসেন

নির্বাহী সম্পাদক : সৈয়দা আফসানা আশা

সকালের আলো মিডিয়া ও কমিউনিকেশন্স কর্তৃক

৮/৪-এ, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০ হতে প্রকাশিত

মোবাইলঃ ০১৫৫২৫৪১২৮৮ । ০১৭১৬৪৯৩০৮৯ ইমেইলঃ newssokaleralo@gmail.com

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত

Developed by IT-SokalerAlo     hit counters Flag Counter