Friday, November 16, 2018
Login
Username
Password
  সদস্য না হলে... Registration করুন
সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির সৃষ্টি করেছে সংলাপ                 ভোটের ঢোল বেজে উঠল                

উপ- সম্পাদকীয়


জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে শ্রদ্ধা রাখতে হবে
আতাউর রহমান মিটন :
সময় : 2018-11-05 23:15:18

অন্যদিনগুলোর মতই আজও আমার অফিসের কুক আফরোজা গম্ভীর মুখে জানালো, ‘গ্যাস নাই, রান্না করা সম্ভব নয়’। বলেই আফরোজা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। বুঝলাম আজও কপালে ভাত নেই। খেতে চাইলে বাইরে থেকে খাবার এনে খেতে হবে। ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা লালমাটিয়ায় দীর্ঘদিন হয় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। খোঁজ নিয়ে জানলাম সমস্যাটা আরও ভয়াবহ মোহাম্মদপুরের কিছু এলাকাসহ মিরপুর অঞ্চলে। দেশের অন্য কোথায় কি অবস্থা আমি জানি না! দিনের পর দিন এভাবে গ্যাস না পাওয়া গেলেও সরকার নির্বিকার। ধাপে ধাপে গ্যাসের দাম বাড়লেও গ্যাস সরবরাহ ‘স্বাভাবিক’ রাখার ব্যাপারে সরকারের কোন পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। সেবা না দিয়ে ‘সেবা মূল্য’ ঠিকই নিচ্ছে সরকার অথচ জনগণের কাছে সরকারের কোন জবাবদিহিতা নেই! জনগণকে জানানো হচ্ছে না প্রকৃত ঘটনা কি, সমস্যার সমাধানই বা হবে কবে! 

গ্যাস না থাকাটা ঢাকা মহনগরের একটা সমস্যা হলেও এই ঘটনা আমার পুরো আলোচনার একটি উদাহরণ মাত্র। শুধু গ্যাসই নয়, বরং সরকারের প্রায় প্রতিটি দপ্তরে জবাবদিহিতা না থাকার সংস্কৃতি বিরাজমান এবং আমরা জনগণ এতে সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্তরিকতা সম্পর্কে হতাশ! বিরাজমান এই হতাশা থেকে বের হওয়ার জন্য সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।  সরকারকে বলতে হবে কেন সমস্যা হচ্ছে এবং সেই সমস্যা সমাধানে তাদের দিক থেকে কি ধরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সর্বত্র একটা আস্থার পরিবেশ তৈরী না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। 

দেশে এখন সংলাপের হাওয়া বইছে। সংলাপ হচ্ছে একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার উপায় প্রসঙ্গে। আগামী বুধবার সন্ধ্যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতৃবৃন্দের দ্বিতীয় দফা এবং সম্ভবতঃ শেষ সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সংলাপ শেষ হলে ৮ বা ৯ নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই সংবাদ সম্মেলন ডেকে সংলাপের সিদ্ধান্তাবলী জানাবেন বলে জানা গেছে। 

চলমান সংলাপের সাফল্য বা ফলাফল নিয়ে জনগণের মধ্যে নানামত, কৌতুহল এবং উদ্বেগ বিরাজ করছে। যদিও রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, প্রথম দফা সংলাপ সফল হয়েছে। একটি মাত্র সংলাপের মাধ্যমেই বিরাজমান স্তুপকায় সমস্যার পূর্ণ সমাধান হওয়ার কথা নয়। সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা একটি সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক এই সংস্কৃতির বিকাশ ও ধারাবাহিকতা সকলের কাম্য। কঠোর মনোভাব পরিহার করে আগ্রহী সকল দল ও জোটের সাথে সংলাপ করার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশকে এগিয়ে নিতে তাঁর আগ্রহের নিদর্শন রেখেছেন। বিরোধিদলের প্রতি আন্তরিকতা ও সহানুভূতি দেখিয়ে ক্ষমতাসীন দল একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক উত্থানে সহযোগিতা করেছেন। আমাদের সমকালীন রাজনীতিতে এটা একটা বিরল ঘটনা। রাজনীতির এই ইতিবাচক প্রবণতা জনমনে স্বস্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছে। 

রাজনীতিকে যদি উগ্রতা, হিং¯্রতা ইত্যাদি থেকে মুক্ত করতে হয় তাহলে সফল সংলাপ প্রয়োজন। সংলাপের সাফল্যই শান্তির পথ। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে আমাদের সংলাপভিত্তিক, জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা দরকার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরাজমান হতাশা তখনই দূর করা সম্ভব হবে যখন সর্বস্তরে সত্যিকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে। বিরাজমান কোন সমস্যার যদি সমাধান করা সম্ভব নাও হয় অন্ততঃপক্ষে ভোক্তা বা জনগণকে কারণ ব্যাখ্যাপূর্বক বিস্তারিত তথ্য জানাতে হবে। সেটা সেবা খাতের জন্য যেমন, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়াবলীতেও। জনগণকে অন্ধকারে রেখে বা জল ঘোলা করে মাছ শিকারের চেষ্টা আমাদের কাম্য নয়। 

উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। প্রয়োজন পারস্পরিক সমাঝোতা। বিভেদ আমাদের এগিয়ে চলার পথে অন্তরায়। আমরা দোষারপের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে যদি সত্যিকারের তথ্য ও উপাত্তভিত্তিক বিশ্লেষণ দিতে পারি তাহলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে না। জনগণ বোকা নয়। গণমাধ্যমের সময়ানুগ ও সক্রিয় উপস্থিতির কারণে দেশের মানুষ খুব সহজেই পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ও ধারণা লাভ করতে পারছে। এই ধারার উত্তরোত্তর বিকাশ প্রয়োজন। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সহযোগিতা। 

সন্দেহ নেই এই মূহুর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হলেও দেশের সর্বত্র জনমনে ভোট উৎসবের হাওয়া বইছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে সংশয় থাকলেও বসে নেই কোন পক্ষই। বিরোধি পক্ষের সমর্থকেরা নানা ভয় ও উৎকণ্ঠা নিয়ে দিনাতিপাত করছে বলে দাবী করেছে। তারা বলছেন, সারাদেশে প্রায় সাড়ে আট হাজার রাজনৈতিক মামলায় তাদের প্রায় ত্রিশ লক্ষের বেশি নেতা-কর্মী হয় জেলে, নয়তো মামলা-হামলার মুখেও নির্বাচন করার অভিপ্রায়ে রাজনীতি করে চলেছেন। 
বিরোধি দল মনে করে সকল রাজনৈতিক মামলাগুলো তুলে না নিলে বহুল কাঙ্খিত ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ প্রতিষ্ঠা হবে না। তফসিল ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ মামলাগুলো তুলে নেয়ার উদ্যোগ না নেয়া হলে, ঘরছাড়া বিরোধি দলের কর্মীদের ঘরে ফিরে আসার সুযোগ না দিলে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ভেস্তে যাবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ। দেশে যে আইনের শাসনের চরম অভাব দেখা দেয় নাই, সেটা প্রমাণ করার জন্যই সরকারকে রাজনৈতিক এই মামলাগুলো তুলে নেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। 

উগ্রতা কারোরই কাম্য নয়। জনগণ সবকিছু দেখছে এবং নিজেদের মত করে হিসেব কষছে। মানুষ রাজনৈতিক অধিকার, মত প্রকাশের অধিকারকে স্বাগত জানায় কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাস, জ্বালাও-পোড়াও, গুম-খুন ইত্যাদিকে সমর্থন করে না। একইভাবে, সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে বিরোধিপক্ষকে দমন করার হীন প্রচেষ্টাও কারো কাম্য নয়। রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবেই। ভিন্ন মত না থাকলে, ভিন্ন মত প্রকাশের সুযোগ না থাকলে গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? আর গণতন্ত্র ছাড়া উন্নয়নের সার্থকতা কি? 

যদিও আমাদের দেশে রাজনীতিতে জনগণের জন্য গৃহিত কর্মসূচী নিয়ে বিতর্কের চেয়ে অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা বেশি হয়ে থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব ঘোষণাপত্র ও ঘোষিত কর্মসূচী থাকলেও মানুষ আসলে ওগুলোর চাইতে কোন সরকারের আমলে কে কি সুবিধা দিয়েছিল সেই আলোচনাতে আবর্ত থাকে। জনগণ সিদ্ধান্ত নেয় নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে। সেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা থেকে শুরু করে নিরাপদ পথ চলার নিশ্চয়তা সবটাই গুরুত্বপূর্ণ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সেই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে আমার ধারণা। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যজোট গঠন করার যে সংস্কৃতি আমরা দেখতে পাচ্ছি সেটাও আমার কাছে ইতিবাচক বলেই মনে হয়। 

আমরা হয়তো উন্নত অনেক দেশের মত দুটি বা সামান্য কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে থাকতে পারব না। কিন্তু আমাদের দেশে সহজেই দল গঠনের যে প্রবণতা বিরাজমান তার বিপরীতে জোট পরিচয়ে হলেও আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছেন সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নির্বাচনকে ঘিরে নয়, কর্মসূচীকে ঘিরেও যদি এভাবে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা সীমিত করা সম্ভব হয় তাহলে জনগণের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থেকে অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে চলতে সুবিধা হয়। 

দেশের বিরাজমান আস্থাহীন রাজনীতির অঙ্গনে সংলাপকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনার শুভ সূচনা হয়েছে। সংলাপের এই ধারা বজায় থাকলে দেশের শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পথে এক নতুন মাত্রা দেখা দিবে। রাজনৈতিক পরিবেশের এই সুবাতাস প্রবাহের ধারা বজায় রাখতে পারলে উন্নয়নের রথে ওঠা বাংলাদেশের গতি আরও বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হবে নতুন মাত্রায়। সেই সম্ভাবনাকে সত্য করতে চাইলে সকল সব পক্ষকেই উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। চেষ্টা করতে হবে কাছে যাওয়ার। বিভেদের পথে হেঁটে নৈকট্য লাভ ঘটবে না।    

মনে রাখতে হবে, এই সংলাপের মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটা নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে যে তাঁরা নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আন্তরিক। সেই আন্তরিকতার একটা প্রকাশ হলো রাজনৈতিক বিবেচনায় করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা। একই ধরণের মামলায় গ্রেফতারকৃত নেতা-কর্মীদের মুক্তি দিতে হবে। সংসদ ভেঙে না দিলেও প্রশাসনের উপর সরকারের কর্তৃত্ব হ্রাস করার নিশ্চয়তা দিতে হবে। জনগণকে বিভ্রান্ত করার, বিপথে পরিচালিত করার চেষ্টা কোনদিনই সফল হবে না। জনগণ ক্ষমতার মালিক। এই জনগণকে উচ্ছেদ করে, মালিককে উচ্ছেদ করে ক্ষমতা গ্রহণ করার চেষ্টা সফল হবে না। 

আমজনতার বিশ্বাস সংবিধানের মধ্যেই বিরাজমান সমস্যার সমাধান রয়েছে। সরকার আন্তরিক হলে, সত্যিকার অর্থে সমস্যা সমাধান করতে চাইলে সমাধান করা সম্ভব। এটা নব্বই এর গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও প্রমাণিত হয়েছে। সংলাপ ফলপ্রসু হলে রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচী দেয়ার যৌক্তিকতা থাকবে না। আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র অতীতেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে শুধু সজাগ হলেই চলবে না, সতর্ক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সরকারের পাশে যাঁরা আছেন তাঁরা সবাই যে সরকারের ভাল চায়, তাঁদের মধ্যে যে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিনিধি নেই সেটা নিশ্চিত হচ্ছি কিভাবে? ষড়যন্ত্রকারীদের তৎপরতা সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। জাগ্রত জনতার উপর নিরাশার জল ছিটানোর চেষ্টায় কোন পক্ষই লাভবান হবে না। বরং আশার প্রদীপে আরেকটু তেল দিলে, আরও কয়েকটি প্রদীপ জ্বালাতে পারলে আরও খানিকটা অন্ধকার দূর করা সম্ভব হবে। শান্তির পথে, সমৃদ্ধির সাথে, এগিয়ে চলুক বাংলাদেশ। 

সকল মন্তব্য

মন্তব্য দিতে চান তাহলে Login করুন, সদস্য না হলে Registration করুন।

সকালের আলো

Sokaler Alo

সম্পাদক ও প্রকাশক : এস এম আজাদ হোসেন

নির্বাহী সম্পাদক : সৈয়দা আফসানা আশা

সকালের আলো মিডিয়া ও কমিউনিকেশন্স কর্তৃক

৮/৪-এ, তোপখানা রোড, সেগুনবাগিচা, ঢাকা-১০০০ হতে প্রকাশিত

মোবাইলঃ ০১৫৫২৫৪১২৮৮ । ০১৭১৬৪৯৩০৮৯ ইমেইলঃ newssokaleralo@gmail.com

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অধিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদিত

Developed by IT-SokalerAlo     hit counters Flag Counter